Syed Anas Pasha

Syed Anas Pasha

বাংলানিউজকে সুরঞ্জিত: দেশ চলছে খসড়া সংবিধানে

লন্ডন: সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারপারসন ও আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, বর্তমানে দেশ চলছে খসড়া সংবিধানের অধীনে।

৭২ এর সংবিধানে ফিরে যেতে আদালতের দেওয়া রায়টিকে একটি ‘কেইস ল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। আর সংবিধান সংশোধনের অধিকার একমাত্র জাতীয় সংসদের বলেও মত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বর্তমানে লন্ডন সফর করছেন। সেখানে শুক্রবার তার হোটেল সুইটে একান্ত সাক্ষাৎকার দেন বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমকে।

সুরঞ্জিত বলেন, বিগত চল্লিশ বছরের পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে `৭২ এর সংবিধানে মূল ভিত্তিগুলো ধরে রেখেই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের মূল সংবিধানে ফিরে যেতে চাই।

সুরঞ্জিত বলেন, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে স্বাধীন বাংলাদেশের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছেন আদালত। জাতিও ফিরে যেতে চায় ’৭২ এর সংবিধানে। কিন্তু বিগত চল্লিশ বছরের পরিবতির্তত বিশ্ব বাস্তবতায় আমরা সংবিধানকে আরো যুগোপযোগী করেই ’৭২ এর সংবিধানে ফিরতে চাই। আর এটি তাড়াহুড়ো করে সম্ভব নয়, বলেই আদালতের দেওয়া রায়ের ভিত্তিতে খসড়া সংবিধান প্রকাশ করে তার ভিত্তিতে আপাতত দেশ পরিচালিত হচ্ছে।

আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আদালতের রায়ের আলোকে ছাপানো সংবিধানকে খসড়া ধরেই আমরা সংবিধান সংশোধনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি --একথা উল্লেখ করে সুরঞ্জিত বলেন, ’৭২ এর সংবিধানে ফিরে যেতে আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ’৭৫-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক শাসনে সংবিধানকে বার বার কাটাছেঁড়া করার সময় স্পর্শকাতর বিভিন্ন বিষয় সংবিধানে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। সেগুলো বিবেচনায় রেখেই সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি কাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্যে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ও বিসমিল্লাহ সংযোজন রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে করা হয়েছ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই বিষয়গুলোর সাথে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির আবেগ-অনুভূতি জড়িত।

‘এই আবেগ, অনুভুতির প্রতি সম্মান দেখিয়েই আমরা এ দুটো বিষয় সংবিধানে রেখেই ’৭২  এর মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি’, বললেন সুরঞ্জিত।

তিনি বলেন, `রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার ফলে অন্যান্য ধর্মের প্রতি বৈষম্যের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। এখন তাই প্রত্যেক ধর্মকেই সংবিধানে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি বিবেচিত হচ্ছে কমিটির কাছে।`

সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান আরও বলেন, বিসমিল্লাহ রেখেই অন্য  ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিকে কিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় সে চিন্তা করছে বিশেষ কমিটি। বিসমিল্লাহ রেখে, এর পাশাপাশি বিসমিল্লাহ্`র বাংলা তর্জমা ও  অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা যাতে যার যার ধর্ম অনুযায়ী সংবিধান পড়া শুরু করতে পারে সেজন্যে মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস-- এ জাতীয় শব্দও সংবিধানে জুড়ে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে কমিটি সদস্যদের মধ্যে।

সুরঞ্জিত বলেন, মোট কথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে ’৭২ এর সংবিধানের মূলভিত্তিকে ঠিক রেখেই বর্তমান বাস্তবতার সাথে যুগোপযোগী করে সংবিধানটি সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিশেষ কমিটি।

সুরঞ্জিত বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে সংবিধানের প্রস্তাবনায় জাতির জনকের স্বাধীনতার ঘোষণাও অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা করছে বিশেষ কমিটি। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম জাতির পিতা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়েও কমিটি সুপারিশ করবে।

ধর্মীয় রাজনীতি থাকছে কি-না, এমন প্রশ্নের উত্তরে সুরঞ্জিত বলেন, ‌`আমরা ধর্মীয় সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক অধিকার ঠিক রেখে, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিষয়েই আলোচনা করছি।`

সংবিধানে ৯৬ ধারা পুনর্স্থাপিত করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে সুরঞ্জিত বলেন, `অকার্যকর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে পার্লামেন্টের কাছে বিচারপতিদের জবাবদিহির বিষয়টি সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে সামরিক শাসকরা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টাই চালিয়ে আসছিল এতোদিন। সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি ওই বিষয়টি এখন বন্ধ করতে চায়। `৯৬ ধারা পুনর্স্থাপিত করে আমরা বিচারকদেরও পার্লামেন্টের জবাবদিহির আওতায় আনতে চাই।`

সুরঞ্জিত বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে বিপ্লবের পর অনেক প্রতি-বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু প্রতি-বিপ্লবের পর আবারও বিপ্লবী চেতনায় ফিরে আসার  কোনো নজির ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে কি-না আমি জানি না। সে ইতিহাস রচনা করেছে বাঙালি জাতি।

তিনি বলেন, ’৭৫ এ জাতির জনককে হত্যা করার মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীরা প্রতিবিপ্লব করেছিল। তার উদ্দেশ্যে ছিল  মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলা। প্রতিবিপ্লবীদের ওই উদ্দেশ্যে ব্যর্থ করে বাঙালি আবারও মুক্তযুদ্ধের চেতনায় মূল বিপ্লবী ধারায় ফিরে এসেছে। এটি ইতিহাসে একটি নতুন সংযোজন।

আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংবিধান বিষয়ক প্রশ্নের বাইরেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের শাসনামল, শেয়ার বাজার পরিস্থিতি ও যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল নিয়েও বাংলানিউজ এর বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

বর্তমান সরকারের শাসনামলকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এই আওয়ামী লীগনেতা বলেন, `একটি সরকার ক্ষমতায় আসে ৫ বছরের জন্যে। ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পরিপূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের যেমন সফলতা আছে, ঠিক তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমালোচনাও আছে। `

সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে সুরঞ্জিত বলেন, বাস্তবতা হলো শেয়ারবাজার পরিস্থিতির দায় সরকার এড়াতে পারবে না। এই দায় নিয়েই  স্থায়ী উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে।

শেয়ার মার্কেটের এমন পরিস্থিতি কাম্য ছিল না উল্লেখ করে সুরঞ্জিত বলেন, `সরকার বিষয়টি মোকাবেলার চেষ্টা করছে। `

তিনি বলেন, শেয়ার মার্কেট নিয়ে যে সমস্যা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের কিছুটা অভিজ্ঞতার কারেণ। এটা মাথায় রেখেই  দায় দায়িত্ব সরকারকে গ্রহণ করতে হবে।
সম্প্রতি শেয়ার ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে অর্থমন্ত্রীর একটি মন্তব্যের সমালোচনা করে সুরঞ্জিত বলেন, `সরকারি দায়িত্বে থেকে কথাবার্তায় আরো দায়িত্বশীল হতে হবে, সংযমী হতে হবে। কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারের মন্ত্রীদের এমন কোনও মন্তব্য করা ঠিক নয়, যে মন্তব্যের কারণে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ পায়।`

যেকোনো পরিস্থিতির দায় দায়িত্ব সাহসের সাথে গ্রহণ করেই সংশ্লিষ্ট ঘটনা বা দুর্ঘটনা মোকাবেলা করার সৎ সাহস থাকতে হবে রাজনীতিক বা সরকারের মন্ত্রীদেও, বললেন সুরঞ্জিত।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সম্পর্কে সুরঞ্জিতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, `দ্রব্যমূল্য  বৃদ্ধির প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই রয়েছে। এটি মোকাবেলা করতে হবে দক্ষতা দিয়ে।`

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের শুধু স্বাধীনতাই দিয়ে যাননি,  অনেক কিছুই দিয়ে গেছেন। এর মধ্যে টিসিবি ও বিএডিসি নামক দুটো সংস্থাও রয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এই টিসিবিকে আরো শক্তিশালী, আরো সক্রিয় করতে হবে। জনবলসহ লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে টিসিবিকে শক্তিশালী করলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এই সংস্থাটি আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই যদি টিসিবিকে লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে সক্রিয় করা হতো তাহলে আজকে এই অবস্থা হতো না। এটি আমাদের অভিজ্ঞতার অভাবের কারণেই হয়েছে। তবুও আশার কথা, এ বছর প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে ২হাজার ৪ শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। এর আগের বছর করেছিলেন মাত্র ৪ শ’ কোটি টাকা। এগুলো যদি প্রথম থেকেই করা হত, তাহলে দ্রব্যমূল্য নিয়ে বর্তমান সমস্যাটি আমাদের মোকাবেলা করতে হতো না। `
সুরঞ্জিত বলেন, `বাজার অর্থনীতি মানে লুটপাটের অর্থনীতি নয়। এর সাথে মিশ্র অর্থনীতির  প্রভাবটিকে একেবারে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রাইভেট ও পাবলিক সেক্টরের একটি প্রতিযোগিতা এখানে থাকতেই হবে। `

কৃষি মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজে সন্তুষ্ট আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, `২১ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ দেওয়ার মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে সরকার, তা অবশ্যই যুগান্তকারী পদপেক্ষ।`
নতুন শিক্ষানীতির ভূয়সী প্রশংসা করে সুরঞ্জিত বলেন, `এই প্রথম একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতির সাথে পরিচিত হতে যাচ্ছে বাঙালি জাতি। জাতি যদি এটি গ্রহণ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবশ্যই লাভবান হবে। `

প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে সুরঞ্জিত বলেন, `ডিজিটাল বাংলাদেশ করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী টেলিকমিউনিকেশন মন্ত্রণালয়। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পারদর্শিতার উপরও এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন অনেকটা নির্ভরশীল। এই দুটো মন্ত্রণালয়ের আরো গতিশীল কার্যক্রম ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে খুবই জরুরি।`

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে সুরঞ্জিত বলেন, `আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে বলেই আমার বিশ্বাস। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচারই এই ট্রাইব্যুনালের কাছ থেকে আশা করছে জাতি ও বিশ্ব সম্প্রদায়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের শীর্ষ ব্যক্তিরা বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই তাদের কাজ চালিয়ে যাবেন আশা করি।`

গ্রামীণব্যাংক থেকে ড. ইউনুসকে অপসারণ করার বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সুরঞ্জিত বলেন, `বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও কূটনৈতিক পর্যায়ের। আমি এতে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।`
 
উল্লেখ্য, কানাডায় কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের একটি কনফারেন্সে যোগ দিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত লন্ডন আসেন। শনিবারই তার দেশের উদ্দেশ্যে লন্ডন ছাড়ার কথা।

বাংলাদেশ সময় ১০২৫ ঘণ্টা, মার্চ ০৫, ২০১১
Link to Article

0 comments:

Post a comment

Popular Posts