Syed Anas Pasha

Syed Anas Pasha

তারেকের ভাবনায় বিএনপির আগামী নির্বাচনের ইশতেহার! (ভিডিও)

সৈয়দ আনাস পাশা, লন্ডন করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
গৌমেন হোটেল দ্য টাওয়ারস, লন্ডন থেকে: তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধীনেই আগামী নির্বাচন হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

বুধবার লন্ডনের গৌমেন হোটেল দ্য টাওয়ারসে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে তিনি এ মন্তব্য করেন। ইফতার পূর্ব আলোচনা সভার প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক নিজ ভাবনা প্রকাশের খোলসে আগামী নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য ইশতেহারই যেন তুলে ধরেছেন নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের সামনে।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন নির্বাচন নয়, মূল ইস্যু তত্ত্বাবধায়ক সরকার সিস্টেম। ভবিষ্যতসমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্যেই এ সিস্টেম ফিরিয়ে আনতে হবে। এ সিস্টেম ফিরিয়ে আনার ওপর নির্ভর করছে একটি জনসম্পৃক্ত, গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়া বা না যাওয়ার বিষয়।

বিএনপির যুক্তরাজ্য শাখার সভাপতি সাইস্তা চৌধুরী কুদ্দুসের সভাপতিত্বে ইফতারপূর্ব আলোচনা সভা পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমেদ।

আগামী নির্বাচনের ইশতেহার
গত ২/৩ দিন ধরে লন্ডনের কমিউনিটিতে আলোচিত ছিল বিএনপির এ ইফতার মাহফিল। তারেক রহমান কেন্দ্রীয় লন্ডনের পাঁচ তারকা এ হোটেলে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তৃতা দেবেন এমন আভাসও দিচ্ছিলেন যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতারা।

ইফতার পূর্ব আলোচনায় তারেক বাংলাদেশ নিয়ে তার ভবিষ্যত ভাবনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মতে, তারেক নিজ ভাবনা প্রকাশের খোলসে আগামী নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারই তুলে ধরেছেন নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের সামনে।

প্রতিপক্ষের সমালোচনা নেই
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তারেক কিছু বলবেন, এমন আশা নিয়ে দলের নেতাকর্মীসহ সাংবাদিকরা গিয়েছিলেন ইফতার মাহফিলে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জোটের রাজনীতি বা প্রতিপক্ষের কোনো সমালোচনাই ছিল না তারেকের বক্তৃতায়।

প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে দেওয়া তারেকের এ বক্তৃতার পুরোটাই ছিল বাংলাদেশ নিয়ে তার ভবিষ্যত ভাবনা। কেমন হতে পারে বাংলাদেশ, তার এই ভাবনা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তুলে ধরে তিনি জানতে চেয়েছেন, এ ভাবনা বা স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব কি না। উত্তরে নেতাকর্মীরা সমস্বরে নেতাকে দিয়েছেন সাহস, বলেছেন, সবই সম্ভব তারেকের নেতৃত্বে।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তারেক রহমান বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ আমাদের গড়ে তুলতে হবে, যে দেশ আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য স্থির করতে হবে, যেকোনো জায়গায় ঢিল ছুঁড়লে চলবে না। অতীতমুখিতা নয়, ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে, এমনই পরামর্শ তারেকের নেতাকর্মীদের প্রতি।

তারেক বলেন, গতানুগতিকতার মধ্যে আবদ্ধ থাকলে চূড়ান্ত লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাতে পারবো না। প্রতিপক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন ও উন্নয়নের রাজনীতির কৌশল নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।

কেন পারবে না বাংলাদেশ
কৃষি, শিক্ষা, পর্যটন, বিদ্যুৎ, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন সেক্টর নিয়ে নিজের ভাবনা প্রকাশ করে তারেক বলেন, পৃথিবীর অন্য দেশ যদি পারে তাহলে কেন পারবে না বাংলাদেশ?

কৃষি ক্ষেত্রে আরো ভর্তুকি বাড়িয়ে এ খাতকে রফতানিকেন্দ্রিক শিল্পে রূপান্তরের তার ভাবনার কথা প্রকাশ করে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ব্রিটেনের সেইন্সবারি, আজদা, টেসকোসহ বড় বড় সুপার স্টোরগুলোতে গ্রোসারিজাত সব সামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। অন্যান্য দেশ যদি ব্রিটেনের মতো দেশের চাহিদা অনুযায়ী গ্রোসারি, পোল্ট্রিসহ অন্যান্য পণ্যের জোগান দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না?

তিনি কৃষি খাতকে শিল্পায়নে রূপদানের মাধ্যমে এমন একটি প্লাটফরম তৈরি করার কথা বলেন, যে প্লাটফরম দেশের কৃষক ও পোল্ট্রি মালিকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের যোগসূত্র সৃষ্টি করে দেবে। কৃষি খাতে প্রয়োজনে আরো ভর্তুকি দিয়ে বাংলাদেশের কৃষিজাত ও পোল্টিজাত পণ্য বিদেশের বাজারে প্রবেশ করানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তারেক বলেন, বাংলাদেশের কৃষি ও পোল্ট্রি প্র্রডাক্টের বর্তমান রফতানি বাজার ১.৫ বিলিয়ন ডলার। কৃষি খাতকে শিল্পায়নে রূপান্তরিত করা গেলে আগামী ৫ বছরে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এ রফতানি বাজার ৫ বিলিয়ন ডলারে উত্তরণ সম্ভব।

গার্মেন্টসের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয়
গার্মেন্টস সেক্টরকে বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম খাত উল্লেখ করে তারেক বলেন, এ খাত যেমন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা দিচ্ছে, ঠিক তেমনি বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেছে। এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করে আরও আধুনিকায়ন করতে পারলে ৫ বছরে ২২ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলার এ খাত থেকে আয় করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তারেক।

তিনি বলেন, গার্মেন্টস সেক্টরের জন্যে আলাদা একটি মন্ত্রণালয় গঠন এখন সময়ের দাবি। গার্মেন্টস পণ্য ছাড়াও অন্যান্য পণ্যের ম্যানুফ্যাকচারিং এবং রফতানির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন দেশের প্রধান বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান।

বহু ভাষায় দক্ষতা অর্জন জরুরি
শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে বিএনপির আগামী দিনের এই কর্ণধার বলেন, ইংরেজিসহ অন্যান্য প্রধান ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে আমাদের। বিশ্ব চাকরি বাজারে আমাদের সন্তানরা যাতে নিজ যোগ্যতায় সহজেই ঢুকতে পারে, সে লক্ষ্যেই বহু ভাষায় দক্ষতা অর্জন প্রয়োজন তাদের।

কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে তারেক বলেন, কারিগরি শিক্ষা বেকারত্ব ঘোচাতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত একটি জনগোষ্ঠি গড়তে পারলে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গঠন করে এ জনগোষ্ঠিকে কাজে লাগানো সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পরিকল্পিত আবাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ১৫ কোটি মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থার জন্যে পরিকল্পিত আবাসনের বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সোলার সিস্টেমকেও কাজে লাগানোর তাগিদ অনুভব করেন তারেক। দেশের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে এ সিস্টেম সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে তার ধারণা।

পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের সোনালি সম্ভাবনা
পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের সোনালি সম্ভাবনা রয়েছে মন্তব্য করে তারেক বলেন, ব্রিটেনের সাফারি পার্কের মত আমাদের সুন্দরবনকে গড়ে তুলতে পারি আমরা। সুন্দরবনের অভ্যন্তরের খালগুলো সংষ্কার করে উন্নতমানের নৌ-যানের মাধ্যমে পর্যটকরা উপভোগ করতে পারেন মুক্ত পশু-পাখির অবাধ বিচরণ। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতকে নান্দনিক রূপে সাজিয়ে তুললে পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকতে পরিণত হবে এটি।

সমু্দ্রের সিলিকনকে মূল্যবান সম্পদ আখ্যায়িত করে তারেক বলেন, আমেরিকায় সিলিকন ভ্যালি ও ব্রিটেনে সিলিকন প্যান থাকলে বাংলাদেশের কক্সবাজারকে কেন আমরা ‘সিলিক্যান বিচ সিটি’ নামে গড়ে তুলতে পারি না?

ব্যক্তি উদ্যোগে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা
ধোলাই খাল, বগুড়া ও সৈয়দপুরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও দক্ষতায় যন্ত্রপাতি নির্মাণের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগের এই সব ছোট ছোট কারখানাকে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিলে যন্ত্রপাতি নির্মাণের বিশাল শিল্প গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশে।

কৃষি খাত, কনস্ট্রাকশন, অটোমোবাইল ও জাহাজ নির্মাণ সামগ্রীর বিরাট শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, একমাত্র কৃষি যন্ত্রপাতির আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে ১২৫ বিলিয়ন ডলারের। চীন যদি ১২ মিলিয়ন ডলারের কৃষি যন্ত্রপাতি বিশ্ববাজারে রফতানি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কি এই বাজারে নিজেদের তৈরি কৃষি যন্ত্রপাতি রফতানি করে ১২৫ বিলিয়ন ডলারের এক শতাংশও বছরে আয় করতে পারে না?
 
প্রয়োজন আরেকটি সাবমেরিন ক্যাবল
প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ডাটা প্রসেসিং, কল সেন্টার, সফটওয়ার ডেভেলপমেন্টে আমাদের তরুণদের যোগ্যতা অন্যান্য দেশের তরুণদের চেয়ে কম নয়। এ যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আয় করতে পারে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

এক্ষেত্রে আরেকটি সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুততর ইন্টারনেট সুবিধা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারলে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারি।

জনগণের পানির চাহিদা পূরণে বর্ষার সময় পানি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তারেক রহমান বলেন, আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জিয়াউর রহমান অনেক আগেই পানি সংরক্ষণের কৌশল আমাদের শিখিয়ে গিয়েছিলেন। নদ-নদী, খাল-বিল খনন করে আমরা বর্ষায় যদি পানি সংরক্ষণ করতে পারি, তাহলে এই পানি দিয়ে কৃষিকাজসহ অনেক কিছুই করা সম্ভব।

যেন ছাত্রদের ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষক
বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে নেতাকর্মীদের প্রশ্নও করেন তারেক। দেশ ও সাম্প্রতিক বিশ্ব সম্পর্কে কেমন ধারণা আছে নেতাকর্মীদের সে সম্পর্কে পরীক্ষাও নেন কারো কারো। যেন ছাত্রদের ক্লাস নিচ্ছেন কোনো শিক্ষক। তার কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কৌতুক করে কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার কথাও বলেন নেতাকর্মীদের।

বক্তৃতার শেষের দিকে ঈদের পর আবারও নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ঘোষণা দেন তারেক। আর বক্তৃতা শেষে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি টেবিলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তিনি।

বাংলাদেশ সময়: ০৭৩৫ ঘণ্টা, জুলাই ২৫, ২০১৩

0 comments:

Post a comment

Popular Posts