Syed Anas Pasha

Syed Anas Pasha

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অফিস অভিমুখে হুমায়ূনের ‘হিমু’

সৈয়দ আনাস পাশা, লন্ডন করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম


লন্ডন: ব্রিটেনে বসবাসরত বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল নায়ক, একাত্তরের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীসহ বিশ্বের অন্য দেশে পালিয়ে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি নিয়ে প্রয়াত নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের হিমু এবার ব্রিটেনের রাজপথে।

ম্যানচেস্টারের ওল্ডহামে অবস্থিত বহির্বিশ্বের প্রথম স্থায়ী শহীদ মিনার থেকে তিনশ’ মাইল পায়ে হেঁটে হিমু তার আর্জি নিয়ে হাজির হবেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অফিস সেন্ট্রাল লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে। আবেদন জানাবেন ব্রিটেন জেন ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের সেইফ হেভেন না হয়।

বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তির কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ একাত্তরের রাজাকারদের ঘৃণা করতে শিখিয়েছিলেন তার একটি নাটকের সংলাপের মাধ্যমে। বহুব্রীহি নাটকে তোতা পাখির মুখে তার তৈরি স্লোগান ‘তুই রাজাকার’ আজ উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে। এই স্লোগান যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনে যেমন প্রেরণা যোগাচ্ছে সারা জাতিকে, ঠিক তেমনি ফাঁসির রজ্জু হয়ে তাড়া করে ফিরছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের।

হুমায়ূন আজ বেঁচে নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া হিমুরা এখনও রয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে শাহবাগের তারুণ্যের জাগরণ আজ হিমুদেরও আলোড়িত করছে। হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘আজ রবিবার’-এ হিমু চরিত্রে অভিনয়কারী ফজলুল করিম তুহিন এমনি এক হিমু। আগুনের পরশমনি চলচ্চিত্রে একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে যে তুহিন অভিনয় করেছিলেন, সেই তুহিন আজ অভিনয় নয়, বাঙালির দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে সত্যি সত্যি নেমেছেন তার সাথীদের নিয়ে।

‘আজ রবিবার’ নাটকের ‘হিমু’ ফজলুল করিম তুহিনের নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ব্রিটেনে এবার ব্যতিক্রমী এক আন্দোলন শুরু করছেন কিছু তরুণ। ম্যানচেস্টারের ওল্ডহাম শহরে অবস্থিত বহির্বিশ্বে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার থেকে এবার তিনশ’ মাইল পায়ে হেঁটে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অফিস অভিমুখে যাত্রা শুরু করবেন শাহবাগ প্রজন্মের প্রতিনিধি তরুণরা। অভিযানে মূল নেতৃত্ব থাকছেন আরেক সাহসী তরুণ সাজ্জাদ হোসেন। যাত্রা পথে বিভিন্ন শহরে তাদের সফরসঙ্গী হবেন বাঙালির দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের আরও বেশ কিছু যোদ্ধা। তুহিন এ কর্মসূচির সমন্বয়ক হিসেবে পালন করছেন মূল দায়িত্ব। তিনিও প্রতিটি শহরে মিলিত হবেন পদযাত্রীদের সঙ্গে। গণজাগরণ মঞ্চ, ইউকের স্থানীয় শাখাগুলোর পক্ষ থেকে যাত্রাপথের প্রতিটি শহরে পদযাত্রীদের নিয়ে করা হবে সমাবেশ। ব্রিটেনের মূলধারার জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে একাত্তরের নৃশংস গণহত্যার কথা। সভ্য দুনিয়ার নেতৃত্বদানকারী ব্রিটেন কেমন করে পালিয়ে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের সেইফ হেভেন হয়? জানতে চাওয়া হবে ব্রিটিশ জনগণের কাছে।

গণজাগরণ মঞ্চ, ইউকের সহযোগিতায় ম্যানচেস্টারের ওল্ডহাম থেকে বুধবার শুরু হচ্ছে কর্মসূচি ‘ওয়াকিং ফর জাস্টিস’।

ওল্ডহামে বহির্বিশ্বে স্থাপিত প্রথম স্থায়ী শহীদ মিনার থেকে বুধবার শুরু হবে এ পদযাত্রা। ম্যানচেস্টার ওল্ডহাম থেকে শুরু করে এই টিম স্টোক অন ট্রেন্ট, বার্মিংহাম, নর্দাম্পটন, লুটন হয়ে লন্ডনে পৌঁছবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ, মঙ্গলবার।

তিনশ’ মাইল পায়ে হেঁটে ‘ওয়াকিং ফর জাস্টিস’ টিম উপস্থিত হবে কেন্দ্রীয় লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিট বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ২৬শে মার্চ দুপুর ১২টায় লন্ডন রিজেন্ট পার্কে সমবেত গণজাগরণ মঞ্চ, ইউকের সঙ্গে এসে যোগ দেবে ‘ওয়াকিং ফর জাস্টিস টিম’। সেখান থেকে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হবে স্মারকলিপি। একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ব্রিটেনে পালিয়ে আসা বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল নায়কসহ অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হবে স্মারকলিপিতে।

বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম শীর্ষস্থান ব্রিটেন যেন যুদ্ধাপরাধী গণহত্যাকারীদের ‘সেইফ হেভেন,-এর কলঙ্কতিলকের অংশীদার না হয়, এটিই অনুরোধ জানানো হবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে। ২৬ মার্চ বিকেল ৩টায় হাউস অব কমন্সের সামনে পদযাত্রীদের উপস্থিতিতে গণসংগীত পরিবেশন করবেন লন্ডনের স্থানীয় শিল্পীরা।

‘ওয়াকিং ফর জাস্টিস’র সমন্বয়ক নাট্যকার ও হিমু চরিত্রের অভিনেতা ফজলুল কবীর তুহিন বাংলানিউজকে বলেন, “মূলত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং যেসব যুদ্ধাপরাধী ব্রিটেনসহ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে বিচারের কাঠগড়ায় তোলার দাবিতেই আমাদের এ পদযাত্রা। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল নায়ক এই ব্রিটেনে বসবাস করছেন। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলাও হয়েছে। আমরা চাই, অবিলম্বে তাকেসহ দেশের বাইরে পালিয়ে থাকা সব যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশে ফেরত নেওয়া হোক।”

লংমার্চে অংশ নেওয়া সাজ্জাদ বলেন, “দেশের জন্য যেখানে এতো মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, এতো মা-বোন সম্ভ্রম দিয়েছেন, সেসব মানুষের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে আমরা মাত্র তিনশ’ মাইল হাঁটবো। এটা তো তুচ্ছ একটি বিষয়। আজ যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে তরুণ প্র্রজন্ম একাত্তরের তো আবার রাজপথে নেমেছে।”

তিনি বলেন, “আমরা ব্রিটেনে বসবাসরতরা এ জাগরণকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ হিসেবেই বিবেচনা করছি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রবাসী পূর্ব প্রজন্ম যেভাবে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধেও আমরা সেভাবে দাঁড়াতে চাই। পায়ে হেঁটে হেঁটে ব্রিটিশ জনগণকে আবার আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- একাত্তরের ইতিহাসের সেই নৃশংসতম গণহত্যার কথা। আমরা তাদের বলতে চাই, দীর্ঘ একচল্লিশ বছর পরে হলেও বাঙালি জাতি ওই নরঘাতকদের বিচার শুরু করেছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা ব্রিটিশ জনগণকে আরও জানাতে চাই, একাত্তরের দু’একজন নরঘাতকের অবস্থানের কারণে মাল্টি ন্যাশনাল ব্রিটেন আজ যুদ্ধাপরাধীদের ‘সেইফ হেভেন’ হিসেবে দুর্নাম কুড়াচ্ছে। এই দুর্নামের ভাগিদার হতে চাই না।”

উল্লেখ্য, নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমদের ‘হিমু’ যাবতীয় আবেগ অনুভূতির বাইরের একটি চরিত্র, যে চরিত্র পৃথিবীর সব যুক্তি-তর্কের বাইরে বসবাস করে। হুমায়ূন আহমেদের এই অনবদ্য ‘হিমু’ চরিত্রে দর্শক কখনো চোখের পানি দেখেনি। হুমায়ূনের মৃত্যুর পর সেই ‘হিমু’ (লন্ডনে বসবাসরত ফজলুল করিম তুহিন) অঝোরে কেঁদেছিলেন। এই  প্রথম পাঠক জেনেছিলেন, হিমুর চোখেও জল আসে!

নাটকের হিমুর প্রধান কাজ  ছিল হলুদ পাঞ্জাবি পরে হাঁটাহাঁটি। তিনি হাঁটতেন নিজের জন্য। এই প্রথম হিমু হাঁটবেন দেশের জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি নিয়ে।

বাংলাদেশ সময়: ১৬২৯ ঘণ্টা, মার্চ ২০, ২০১৩
Link to article

0 comments:

Post a comment

Popular Posts