Syed Anas Pasha

Syed Anas Pasha

রোশনারাকাণ্ড: অজানা আশঙ্কায় ব্রিটেনের বাঙালি অভিভাবকরা

লন্ডন: ব্রিটেনের সাবেক মন্ত্রী ও লেবার দলীয় বর্তমান এমপি স্টিফেন টিম্সকে হত্যাচেষ্টার দায়ে বাঙালি তরুণী রোশনারা চৌধুরীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। আর তা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে ব্রিটেনে বসবাসরত বাঙালি অভিভাবকদের। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম.বিডির কাছে কয়েকজন অভিভাবক তাদের আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন।

তাদের এ শঙ্কা অমূলক নয়। ৩ নভেম্বর বুধবার রোশনারার যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় ঘোষণার সময় আদালতের বাইরে রোশনারার পক্ষে কয়েকজন তরুণ চরমপন্থি বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।  এরা বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং  চরমপন্থি হিসেবে অভিযুক্ত।  লন্ডনভিত্তিক একটি মৌলবাদী সংগঠনের সদস্য এসব তরুণ রোশনারাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘হিরো’ বানানোর তৎপরতা চালায়। ব্রিটিশ মিডিয়া এদের বিক্ষোভের খবর ফলাও করে প্রচার করে এবং এদের তৎপরতার কঠোর সমালোচনাও করে।

ব্রিটেনে তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আজকের তরুণরা শিক্ষাদীক্ষায় নিজেদের জন্য একটি উজ্জ্বল অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর মূলধারার ব্রিটিশ সমাজে বাঙালিরা আজ একটি সম্মানজনক অবস্থান পেয়েছে। আজকের এই পর্যায়ে আসতে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্রিটিশ বাঙালিদের অনেক চড়াই উতরাই পেরোতে হয়েছে। এখন প্রয়োজন তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্রিটিশ সমাজে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার দিকে সব মনযোগ নিবদ্ধ করা। কিন্তু রোশনারাকাণ্ড সমগ্র বাঙালি কমিউনিটির স্বার্থের পিঠে ছুরি মেরেছে। গোটা কমিউনিটিই হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। কমিউনিটির অনেকে তাই এই ঘটনাকে নতুন এক ষড়যন্ত্রের আভাস হিসেবেই দেখছেন।

সন্ত্রাস ও মৌলবাদ সম্পৃক্ততার জন্য লন্ডনে পাকিস্তানি কমিউনিটি সবার সন্দেহের পাত্র। এখন ইসলামী চরমপন্থার সঙ্গে গুটিকয় বাঙালি তরুণ-তরুণীর সম্পৃক্ততা পাকিস্তানি কমিউনিটির মত বাঙালি কমিউনিটিকেও ব্রিটিশ সমাজের কাছে হেয় করবে, সন্দেহের বস্তুতে পরিণত করবে।

বাংলানিউজের কাছে এমনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে। একটি ব্রিটিশ ডানপন্থি পত্রিকার ব্যানার হেডিং ‘মুসলিমস টেল ব্রিটিশ: গো টু হেল’। এই হেডিং বর্ণবাদীদের নড়ে চড়ে বসারই ইঙ্গিত বলে অনেকে মনে করছেন। অনেক ব্রিটিশ রাজনীতিক এখন চরম বর্ণবাদী দল ব্রিটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) ভাষায় কথা বলতে শুরু করে দিয়েছেন ।

রোশনারার যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় ঘোষণাকালে আদালতের বাইরে বিক্ষোভ করা নিয়েও সমালোচনামুখর তারা। জুরি বোর্ডের একজন মুসলিম সদস্যা রায় প্রদান শেষে যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাকে গালমন্দ করে বিক্ষোভকারীরা।

কয়েকজন এমপি তাই প্রশ্ন তুলেছেন, আদালত অবমাননার জন্যে কেন এদের গ্রেফতার করা হলো না? কনজারভেটিভ পার্টির এমপি ফিলিপ ডেভিস তো অনেকটা ব্রিটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) নেতাদের মতোই প্রকাশ্যে বর্ণবাদী মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছেন: ‘ব্রিটিশ সমাজকে যারা পছন্দ করে না, তারা চলে যেতে পারেন এই দেশ ছেড়ে।’

 শিক্ষা, হাউজিং, চাকুরি, বেনিফিট ইত্যাদি ক্ষেত্রে বর্তমান কাটছাঁটের নীতি বাস্তবায়নে সরকার এমনিতেই ছোটোখাটো ছুতো আবিষ্কারের চেষ্টায় আছে। সেখানে ইসলামী চরমপন্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততার ছুঁতোও সেখানে বাঙালি কমিউনিটির জন্যে বিরাট সমস্যা বয়ে আনতে পারে।

আদালতের সামনে রোশনারার পক্ষে বিক্ষোভকারী সামসুদ্দিন ও সালিম সরকারি বেনিফিটের টাকা পকেটে পুরে রাষ্ট্র ও সমাজবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত -- মূল ধারার কিছু মিডিয়া এমন বক্তব্যও প্রচার করছে।

ব্রিটেনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুতদের সবচেয়ে বড় কমিউনিটি সংগঠন বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম।  বাংলানিউজকে তিনি বলেন, একটি চিহ্নিত অপশক্তি ইসলামি চরমপন্থার দিকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার সুদূরপ্রসারি ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। রোশনারার ঘটনা এরই অংশ। এটা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

লন্ডনের বাঙালিদের পরিচালনাধীন অন্যতম বড় মসজিদ, ব্রিকলেইন জামে মসজিদ। এ মসজিদের প্রধান ইমাম মাওলানা জিল্লুর রহমান চৌধুরী।  বাংলানিউজকে তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ সমাজে আমরা আমাদের ধর্মকর্ম পালনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করছি, অথচ আমাদেরই কিছু বিপথগামী সন্তান ইসলামের নামে সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত হচ্ছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক।’  তিনি অভিভাবকদের প্রতি আবেদন জানিয়ে  বলেন, ‘পাঠ্য বইয়ের বাইরেও ইসলাম ধর্মের উদারতা সম্পর্কে সন্তানদের শিক্ষা দিন।’ আর চরমপন্থার দিকে তরুণ প্রজন্মকে যারা আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে তাদের প্রতি মাওলানা জিল্লুরের অনুরোধ, ‘ধর্মের নাম নিয়ে এমন কাজ করবেন না, যাতে আমাদের ধর্মপালনই কঠিন হয়ে পড়ে।’

টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার ষাটোর্ধ্ব বাঙালি গৃহিনী আলেয়া খাতুন বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা যখন প্রথম এদেশে আসি, তখন এলাকার এক খ্যাতিমান আলেমের কাছ থেকে দোয়া নিতে গেলে তিনি বলেছিলেন, ‘যে দেশে যাচ্ছো, সেদেশের আইন কানুন মেনে চলো, সে সমাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রেখো। অথচ এখন আমরা কি দেখছি, যে দেশে থাকছি, খাচ্ছি, বেনিফিটসহ সব সুযোগ সুবিধা নিচ্ছি সেদেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনার কুপরামর্শ দেয়া হচ্ছে আমাদের সন্তানদের। যার প্রমাণ রোশনারার মত একটি মেধাবী মেয়ের এই পরিণতি। এই সংক্রামক ব্যাধি আর কত মায়ের সন্তানকে বিপথগামী করবে আল্লাহই জানেন।’

আরেক গৃহিনী রহিমা বেগমের উদ্বেগ, তাঁর ডিগ্রিধারী ছেলেটা হয়তো আর কোন কাজই পাবে না। রোশনারাকাণ্ডের কারণে তার ধর্মপ্রাণ ছেলেকেও হয়তো সন্দেহের চোখে দেখা হবে। তাঁর আশঙ্কা,‘সরকারি বেনিফিট বন্ধ হয়ে গেলে, ছেলে কাজ না পেলে আমাদের আর থাকলো কি!’
রোশনারা যে বারায় বসবাস করতেন সেখানে কর্মরত সংগঠন নিউহ্যাম ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সভাপতি লাকি মিয়া।  বাংলানিউজকে তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম যাতে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে না পড়ে সেটা নিশ্চিত করতে আমরা একাধিক প্রকল্প নেয়ার চেষ্টা করছি। এটি  আমাদের অস্থিত্ব রার জন্যেও খুব জরুরি। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেবার পার্টির একজন বাঙালি নারীসদস্য বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার ১৩ বছরের ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করে: ‘কে বড় অপরাধী স্টিফেন টিমস, নাকি রোশনারা? ইরাকযুদ্ধে সমর্থন দিয়ে ইরাকের লাখ লাখ লোকের রক্তে লাল হয়েছে টিমস- এর মত এমপিদের হাত। আর টিমসকে ছুরি মেরে মাত্র একজনের রক্তে লাল হয়েছে রোশনারার হাত। কার অপরাধ বড়?’

ঐ গৃহিনী উদ্বেগকাতর কন্ঠে বলেন, ‘এ ধরনের প্রশ্ন যদি আমাদের সন্তানদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়, তাহলে এর পরিণতি যে কী তা চিন্তা করলেই মাথা ঘুরে যায়।’
বাংলাদেশ সময় : ১৪৪২ ঘণ্টা, নভেম্বর ৮, ২০১০।
Link to Article

0 comments:

Post a Comment

Popular Posts